যদা যদা হি ধর্মস্য... গীতার এই শ্লোকে ঠিক কী বলা হয়েছে?
(যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত –
গীতার এই শ্লোকটি নিয়ে আমি এখানে কিছু কথা বলবো। কথাগুলি বলছি মূলত জগদীশচন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের লেখা ''শ্রীগীতা গ্রন্থখানি, জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের 'সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভগবদগীতা' এবং ড.আম্বেদকরের লেখা অনুসরণ করে)
ভগবান বলছেন " যখন ভারতে ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই আমি নিজেকে সৃষ্টি করি। সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্কৃতীদের বিনাশ ; আর ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।" —এইসব কথাগুলি গীতার শ্লোকে বলা হয়েছে। আর গীতা হলো কুরুক্ষেত্রে পাণ্ডব এবং কৌরবদের মধ্যকার যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা গ্রন্থ।
এই শ্লোকে বা গীতার অন্য কোথাও নির্দিষ্ট করে বলা হয় নি দুষ্কৃতি কারা এবং সাধু কারা —কোন পক্ষকেই স্পষ্ট করে চিহ্নিত করা হয় নি বা সংজ্ঞায়িত করা হয় নি। ভগবান কীভাবে দুষ্কৃতীদের বিনাশ করে সাধুদের রক্ষা করবেন এবং ভারতে কোন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন — সে কথাও সুস্পষ্টভাবে গীতায় উল্লেখ করা হয় নি। সবই বলা হয়েছে আভাস ইঙ্গিতে, সবই পরোক্ষভাবে বিধৃত। তবে যেহেতু গীতা কৌরব এবং পাণ্ডবদের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত, তাই নানা কাহিনী ও ঘটনা বিশ্লেষন করে এই শ্লোকের অর্থ এবং উদ্দেশ্য নির্ণয় করা সম্ভব। আমি সেই বিষয়ে কিছু বলবো। এই প্রসঙ্গে আমাদের একথাও স্মরণে রাখতে হবে যে, হিন্দু ধর্মে বৌদ্ধ, খ্রিস্ট, চৈতন্য প্রভৃতি এদেরকেও অবতার বা আধা অবতার বলে মেনে নেওয়া হয়েছে ; কিন্তু তাদের কাজের মধ্যে কোন অসুর বিনাশের কাহিনী নেই!
সাধারণভাবে গীতাকে মহাভারতের ক্রম পল্লবিত কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে পড়া হয় এবং মনে করা হয় যে, অধার্মিক ও দুষ্কৃতি কৌরবদের বিনাশ করে ধার্মিক এবং ন্যায়ের প্রতিমূর্তি পাণ্ডবদের রক্ষা করার জন্য অবতার রূপে শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রে অর্জুনের সারথি রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আর এভাবে প্রাচীন ভারতে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সাধারণভাবে মানুষের এটাই মনে হয় এবং এই ধারণা বহুল প্রচারিত ও প্রচলিত। কিন্তু খুঁটিয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ছিল ক্ষত্রিয়দের রাজ্য লোভে জ্ঞাতিযুদ্ধ। এই যুদ্ধে কোন পক্ষকে পুরোপুরি সাধু বলা যায় না বা বিপক্ষকে পুরোপুরি অসাধু বলা যায় না।
মহাভারতের গল্প বা ঘটনা অনুযায়ী এবং তখনকার রীতি অনুযায়ী অন্ধ বলে বড় ভাই ধৃতরাষ্ট্রের বদলে পান্ডু রাজা হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ছেলেদের মধ্যে জেষ্ঠ ছিলেন দূর্যোধন, তাই তার রাজা হবার কথা। তাছাড়া পাণ্ডবরা কুন্তীর ছেলে হলেও, তারা আসলে পান্ডুর ছেলে ছিলেন না। তাই হস্তিনাপুরের সিংহাসনে পাণ্ডবদের কোন দাবি থাকার কথা নয়। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের দাক্ষিণ্য বা দয়াতেই পাণ্ডবরা অর্ধেক রাজত্ব পেয়েছিলেন। জুয়া (পাশা) খেলে তারা সেই
রাজ্য হারান এবং দ্রৌপদী সহ পাঁচ ভাই দাসত্ব বরণ করেন। স্নেহের বশবর্তী হয়ে প্রথমবারের জন্য ধৃতরাষ্ট্র তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেন এবং রাজ্য ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করেন। দ্বিতীয়বার জুয়া খেলে হেরে গিয়ে পাণ্ডবরা বনবাসে যেতে বাধ্য হন। আরো পরে এই রাজ্যের অধিকার বা রাজত্ব নিয়েই কুরুক্ষেত্রে জ্ঞাতিযুদ্ধ হয়েছিল।
বলা হচ্ছে দুষ্কৃতি দমনের কথা। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষ সব ধ্বংস হয়েছে আর পাণ্ডব পক্ষ বেচেঁ রইলো, এমনটি কিন্তু হয় নি। পাঁচ পাণ্ডব, কয়েকজন মাত্র যাদব যোদ্ধা এবং দ্রৌপদী ছাড়া পাণ্ডব পক্ষের প্রায় সবাই নিহত হন। ধর্মের প্রতিভূ পাঞ্চাল বংশ একেবারেই নির্বংশ হয়ে যায়। দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রের সবাই মারা যান। অন্যদিকে কৌরব পক্ষে ধৃতরাষ্ট্র, কৃপ, যুযুৎসু, বিদুর ও সঞ্জয় বেঁচে ছিলেন। তাহলে এই ঘটনায় বোঝা যায় যে, সাধুরা নিষ্কৃতি পেল, আর দুষ্কৃতীরা বিনাশ হলো — এমন ঘটনা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে হয়েছে, একথা বলা যায় না।
আর যুদ্ধের পরের ঘটনা হলো — অশ্বথাম্বার ঘটনায় মিথ্যা কথা বলার জন্য যুধিষ্ঠিরের মায়ানরক দর্শন করতে হয়। সেটা ঘুরে স্বর্গে পৌঁছাতে তার কিছুদিন দেরি হয়ে যায়। তিনি স্বর্গে পৌঁছে দেখেন তার অনেক আগেই কৌরব ও পাণ্ডব দুই পক্ষেরই নিহত ক্ষত্রিয় যোদ্ধারা স্বর্গে গিয়ে আনন্দে বসবাস করছেন। দুর্যোধনেরও স্বর্গবাস হয়। এমনকি সরোবরের তীরে দূর্যোধন যখন আহত অবস্থায় পড়ে ছিলেন, তখন দেবতা, অপ্সরা, গন্ধর্বরা তার উপর পুষ্পবৃষ্টি করেন। এটা কেন? পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের অবহিমালয় অঞ্চলে দুর্যোধনের নামে মন্দিরও আছে! এটাই কি দুষ্কৃতি বিনাশের উদাহরণ! সাধুর রক্ষা আর দুষ্কৃতি বিনাশের সংকল্পের কথা মিলছে কী?
মহাভারতের বনপর্বে মার্কণ্ডেয় ঋষীর বক্তব্য থেকে জানা যায় অন্ধ্র, শক, পুলিন্দ, যবন, শুর, আভির এইসব নীচু জাতির লোকজনেরাও বিপুল সংখ্যায় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এবং নিহত হয়। শান্তিপর্বে ভীষ্মের উক্তি থেকেও জানা যায় যে, উত্তরাপথ এবং দক্ষিনাপথের বিপুল সংখ্যক চণ্ডাল, কাক প্রভৃতি নিন্মজাতির মানুষ, যাদের অনার্য বা অসুর বলা হত ; অর্থাৎ যারা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি (আর্য সংস্কৃতি) মানতেন না, এমন লক্ষ লক্ষ মানুষ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব ও পাণ্ডব — এই উভয় পক্ষে অংশ নিয়ে নিহত হয় এবং তাদের জায়গা কিন্তু নরকে হয়েছিল ; অর্থাৎ তারা শাস্তি পেয়েছিল!
তাহলে এক্ষেত্রে কিন্তু সাধু বা দুষ্কৃতির প্রশ্ন রইলো না, এখানে জাত -বর্ন হয়ে গেল শাস্তি ও বিনাশের মাপকাঠি! উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঋগবেদ অনার্যদের দস্যু বা অসুর বলে উল্লেখ করেছে, মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে চতুর্বনের বাইরে সব মানুষ দস্যু। আবার সেখানে একথাও বলা হয়েছে যে, যারা যজ্ঞ করে না তারা সবাই অসুর। অর্থাৎ আর্য সমাজের বাইরে সবাই অসুর। শুদ্ররা যজ্ঞ করার অধিকারী না হলেও তারা চতুর্বর্নের অন্তর্ভুক্ত, তাই তারা দাস ; কিন্তু অসুর নয়। অবশ্য যদি তারা স্বেচ্ছায় ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের বশ্যতা মেনে নেয়। আর বলা হয়েছে স্বর্গের দেবতাদের মত, মর্ত্যলোকের দেবতা হলো ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়!
ভীষ্মের বর্ণনায় জানা যায় যে, সত্য যুগে নিন্মজাতির অস্তিত্ব ছিল না, ত্রেতা যুগ থেকে তাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে (আসলে এরা হলো বর্নসংকর)। ভীষ্মের কথায় এইসব মানুষেরা নিতান্ত কদর্য (ব্রাহ্মণ্যধর্ম মানে না), তাই ভগবান ভূতভাবনের ইচ্ছানুসারে (চক্রান্ত করে) তাদের কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে নামিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি বাঁধিয়ে শেষ করা হয়। মনে হয় এসব উক্তির মধ্যে যুগে যুগে ভগবানের আবির্ভাবের কারণের কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এই লেখার শেষের দিকে আমরা এইসব ইঙ্গিত অনুসরণ করে সত্য জানার চেষ্টা করবো।
ন্যায় অন্যায় নিয়ে এখানে দুচার কথা বলে আমরা আরো কিছু বোঝার চেষ্টা করবো — মৃত্যুশয্যায় শুয়ে ভীষ্ম বধ, দ্রোনবধ, কর্নবধ, ভীমের দ্বারা নিজের উরুভঙ্গ — কৃষ্ণের বিরুদ্ধে এসব অন্যায় যুদ্ধের অভিযোগ এনে দূর্যোধন বলেছিলেন, " হে কংসদাসতনয়,..... তোমার দ্বারা উদ্ভাবিত অন্যায় উপায় দ্বারা প্রতিদিন ধর্মযুদ্ধে প্রবৃত্ত হাজার হাজার নরপতি নিহত হয়েছেন। তাই তোমার তুল্য পাপাত্মা, নির্দয় এবং নির্লজ্জ আর কে আছে? ন্যায়যুদ্ধে জয়লাভ করা তোমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।"
এই অভিযোগ কৃষ্ণ অস্বীকার করেন নি। পাণ্ডবদের তিনি বলেন, " কৌরব বীরেরা অসাধারণ যুদ্ধবিশারদ ছিলেন। যদি এরকম কুটিল ব্যবহার না করতাম, তাহলে তোমাদের জয়লাভ, রাজ্যলাভ এবং অর্থলাভ সম্ভব হতো না। মহাত্মা সুরগণ (দেবতা) কূটযুদ্ধের অনুষ্ঠান করেই অসুরদের পরাজিত ও খুন করেছেন। তাদের অনুকরণ করা কর্তব্য।"
ভীম অন্যায় যুদ্ধে দুর্যোধনকে বধ করায় ক্রুদ্ধ বলরাম তার নাঙল নিয়ে ভীমের দিকে তেড়ে যান। কৃষ্ণ তার সহোদরকে বোঝাতে বললেন, " শাস্ত্রে ৬ প্রকার উন্নতি - অবনতি নির্দিষ্ট আছে — নিজের উন্নতি, মিত্রদের উন্নতি ও তাদের বন্ধুদের উন্নতি। আর শত্রুর অবনতি, শত্রুর মিত্রদের অবনতি ও তাদের বন্ধুদের অবনতি।" — প্রাজ্ঞব্যক্তি মিত্রদের অবনতি দেখলে নিজের ক্ষয় উপস্থিত জেনে অবিলম্বে প্রতিবিধান করবেন। পাণ্ডবদের সাথে আমাদের যোনিসম্পর্ক ও সৌহার্দ্য। তাই মূলত যাদবকুলের জাগতিক স্বার্থেই আমি অন্যায় উপায়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে পাণ্ডবদের জয়লাভে সাহায্য করেছি।" তিনি এভাবে বলরামকে বোঝান।
আসলে প্রবল মিত্রপক্ষের সহায়তা লাভ করে দূর্যোধন দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেছিলেন। মৈত্রী স্থাপনের সমস্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সেজন্য উদ্দাম ক্ষত্রিয়তেজ বিধ্বস্ত করতে কৃষ্ণ কৃতসংকল্প হয়েছিলেন এবং নানা কৌশলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেন।
যুদ্ধ শেষে ধর্মরাজ্য বা ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে কী? — নীতি অনুযায়ী পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থ র উপর অধিকার যদি থেকেও থাকে, হস্তিনাপুরের উপর ছিল না। ধৃতরাষ্ট্র তখনও জীবিত, রাজা। পাণ্ডবদের দুঃসময়ে ধৃতরাষ্ট্র যখন পাণ্ডবদের রাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ও দ্রৌপদীকে দাসত্ব মুক্ত করেছিলেন, তখন তিনি যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, " আমি অন্ধ। আমাকে এবং গান্ধারীকে তোমরা দেখো।" — কিন্তু যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির বৃদ্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে সিংহাসনচ্যুত করে দুই রাজ্যের দখল নিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর ৩৬ বছর যুধিষ্ঠির রাজত্ব করেন। এই সময়ে কোন মঙ্গলজনক কাজের খতিয়ান মহাভারতের পাতায় লেখা নেই। রাজ্যের চারিদিকে শুধু অশান্তি, মৃত্যু আর বিশৃংখলার কথা লেখা আছে মহাভারত গ্রন্থের পাতায়।
তবুও শান্তিপর্বের একটা ঘটনা থেকে মহাভারতে ''ধর্মরাজ্য " প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ঠিক কী বলতে চাওয়া হয়েছে, তা বোঝার চেষ্টা করা যাক। — আমরা জানি, প্রাচীন ভারতে লোকায়ত নাস্তিকতাবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন চার্বাক। মহাভারতের বনপর্বে দ্রৌপদী নাস্তিকদের অনেক দোষারোপ করে তাদের চার্বাকপন্থি বলেছেন। আবার মৃত্যুশয্যায় দূর্যোধন আক্ষেপ করে বলছেন যে, তার প্রতি এই অন্যায় আচরণ যদি চার্বাক জানতে পারেন!
মনে হয় যুদ্ধের পর চার্বাক হস্তিনাপুরের এসেছিলেন। যখন সিংহাসনে বসবার জন্য যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরে প্রবেশ করছেন, তখন রাস্তার দুধারে হাজার হাজার ব্রাহ্মণ তাকে আশীর্বাদ করতে থাকেন। এরই মধ্যে একজন যুধিষ্ঠিরকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে বলেন, " আপনি জ্ঞাতিঘাতী, গুরুজনদের বিনাশ করেছেন। এখন আপনার মৃত্যুই শ্রেয়, আপনার বেচেঁ থাকার কোন মানে হয় না।" একথা শুনে যুধিষ্ঠির থমকে যান এবং ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে বলেন, " হে বিপ্রগণ, আমি প্রণত হয়ে আপনাদের কাছে প্রার্থনা করছি, আপনারা আমার প্রতি প্রসন্ন হন। আমি অচিরেই প্রাণত্যাগ করবো।"
ব্রাহ্মণরা তখন বললেন যে, তারা যুধিষ্ঠিরকে ধিক্কার জানান নি, ধিক্কার জানিয়েছেন চার্বাক রাক্ষস, সে দুর্যোধনের বন্ধু। এই কথা বলে ব্রাহ্মণরা সমবেতভাবে তার দিকে ক্রোধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং ক্রোধাগ্নিতে চার্বাক বজ্রাঘাতে দগ্ধ বৃক্ষের মত ভূতলে নিপতিত হলেন! প্রকৃতপক্ষে তাকে হয়তো গণধোলাই দিয়ে খুন করা হলো!
আসলে বিষয়টা কী? ঘটনার সময় শ্রীকৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের পাশেই ছিলেন। এবার তিনি বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন — " ব্রাহ্মণ সতত অর্চনীয়। তারা ভূতলের দেবতা। তারা ক্রুদ্ধ হলে তাদের বাক্য থেকে বিষ নির্গত হয়। সত্য যুগে চার্বাক নামে এক রাক্ষস বদরী তপোবনে তপস্যা করে প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে বর পেয়েছিলেন যে, কোন প্রাণী থেকে তিনি ভয় পাবেন না। তবে শর্ত ছিল যে, তিনি ব্রাহ্মণদের অপমান করতে পারবেন না, তাহলে বিপদ হবে।
চার্বাক দেবতাদের নিন্দামন্দ করতেন, সেজন্য তারা একদিন ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। ব্রহ্মা দেবতাদের বলেন, দুর্যোধনের সাথে চার্বাক রাক্ষসের বন্ধুত্ব হবে এবং দুর্যোধনের প্রতি স্নেহবশত সে ব্রাহ্মণদের অপমান করবে। এরফলে ব্রাহ্মণরা অভিশাপ দিয়ে তাকে দগ্ধ করবে। সেই চার্বাক রাক্ষস এখানে এখন ব্রহ্মদণ্ডে নিহত হয়েছে।
তাই যুধিষ্ঠির, আপনি এখন আর শোক প্রকাশ করবেন না। আপনার জ্ঞাতিবর্গ ক্ষত্রিয়ধর্ম মেনে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হয়েছিলেন এবং নিহত হয়ে দেবলোকে গমন করেছেন। তাই, এখন সবকিছু ভুলে রাজকাজ, শত্রুসংহার, প্রজাপালন এবং ব্রাহ্মণের অর্চনা করাই আপনার কর্তব্য।"
এই চার্বাক বধের কাহিনী এবং কৃষ্ণের উক্তি থেকে মহাভারতে অবতার দ্বারা ধর্ম সংস্থাপন বিষয়ে কিছু আন্দাজ করা যায়। তাহলো — ক্ষত্রিয়দের যেকোন উপায়ে যুদ্ধজয় ও রাজ্যলাভ করা বৈধ, ব্রাহ্মণরা ভূতলের দেবতা এবং তারা রাজাদের দ্বারা সব সময়েই পূজিত ; আর নাস্তিকরা হলেন রাক্ষস বা অসুর। সেজন্য চার্বাক কাহিনী থেকে সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় শ্রেণীর শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত চাতুর্বর্ন প্রথা, যাগযজ্ঞ, পরলোক ও ঈশ্বর বিশ্বাস — এই ব্রাহ্মণ্যধর্ম প্রতিষ্ঠাই মহাভারতে বর্ণিত অবতারের দ্বারা ধর্ম সংস্থাপনের ঘোষণা।
গীতার ভগবান, বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্মের অহিংসা তত্ত্বের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার। কারণ এই দুই ধর্ম বর্নভেদ,আত্মা, ঈশ্বর, পরলোক, যজ্ঞকর্ম এসব কিছুই মানে না। সেজন্য বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী বিপুল সংখ্যক অসুরদের বিনাশ করে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হলো গীতায় বর্ণিত ভগবানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। আর প্রকৃতপক্ষে শঙ্করাচার্যর সময়কালে সবচেয়ে বেশি নির্যাতন বৌদ্ধদের উপর হয় এবং তাদের মধ্যকার বহুজনকে খুন করা হয়।
কিন্তু বৌদ্ধরা ছিল অহিংস, তাই সশস্ত্র মহাযুদ্ধে তাদের বিনাশ করার প্রাসঙ্গিকতা ছিল না। সেজন্য রাষ্ট্রশক্তির সহযোগিতায় ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় এবং উচ্চবিত্ত বৈশ্যশ্রেণীর দ্বারা পীড়নের মাধ্যমেই তাদের দাবিয়ে রাখা সম্ভব ছিল এবং সেই কারণেই অবতার কাহিনী, মনুস্মৃতি, গীতা — এসবের প্রয়োজন করা হয়েছিল। বৌদ্ধরা ছাড়াও বহুসংখ্যক ম্লেচ্ছ অনার্য, দেশজ অনার্য এবং লোকায়ত নাস্তিকেরা ছিল জনগণের এক বড় অংশ। তারাও ব্রাহ্মণ্যধর্মকে সম্পূর্ন প্রত্যাখ্যান করেছিল। এদের ধ্বংস করে ভারতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার কাজ হলো গীতায় বর্ণিত ধর্ম সংস্থাপন!
শঙ্করাচার্য আবির্ভাবের আগে গীতা সম্পর্কে বিশেষ কেউ কিছু জানতেন না। গীতা গ্রন্থখানির সৃষ্টি খ্রিস্টের জন্মের কিছু আগে থেকে শুরু করে ৬০০/৭০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কোন এক সময়ে বা দীর্ঘকাল ধরে গীতা রচিত হয়ে থাকলেও, শঙ্করাচার্যের দ্বারা গীতা প্রচারের আগে গীতা অপরিচিত ছিল। শঙ্করাচার্য গীতার ভাষ্য লেখেন এবং ভগবদগীতা প্রচারের আলোয় নিয়ে আসেন। শঙ্করাচার্যের সময়কাল হলো ৭৮৮ সাল থেকে ৮২০ সাল পর্যন্ত। তিনি তার গীতা ভাষ্যে ' যদা যদা হি ধর্মস্য…ইত্যাদি শ্লোকের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, " হে ভারত, যখন যখন নিকৃষ্ট প্রাণীদের অভ্যুদয় ও বর্ণাশ্রম ধর্মের হানি হয় এবং অধর্মের উত্থান হয় — তখন আমি মায়া দ্বারা নিজেকে সৃষ্টি করি" (ভগবদ গীতা, ৪/৭-৮, শংকরভাষ্য)।
এই শ্লোকের আনন্দগিরি টিকায় শংকরভাষ্যের অনেকটা বেশি বিস্তারিত এবং বলিষ্ঠ সমর্থন পাওয়া যায়। আরো এক ধাপ এগিয়ে শঙ্করাচার্য তার গীতাভাষ্যের উপক্রমণিকায় বলেছেন, " সে ধর্ম বর্ণাশ্রমসেবী এবং শ্রেয়লাভে ইচ্ছুক ব্রাহ্মণদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। অধর্মের দ্বারা ধর্ম অভিভূত হওয়ায় এবং অধর্ম বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে, জগতের স্থিতিকে রক্ষা করার লক্ষ্যে সেই আদিকর্তা নারায়ণ নামক বিষ্ণু, ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণত্ব রক্ষার জন্য বাসুদেবের ঔরসে দেবকীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাহ্মণত্বের রক্ষাতেই বৈদিক ধর্ম রক্ষিত হয় ; কারণ বর্ণাশ্রম ভেদ ব্রাহ্মণত্বের অধীন।"
সেজন্য এই সিদ্ধান্ত করা যায় যে, গীতার রচনাকারেরা গীতার অবতার চরিত্রের ঐতিহাসিক ভূমিকাকে অনার্য অসুরদের বিনাশ করে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রতিষ্ঠা হিসাবেই দেখতে চেয়েছেন। ব্রাহ্মণ্যধর্ম, বিশেষ করে বর্নভেদ ভিত্তিক আর্থসামাজিক কাঠামোকে রক্ষার জন্যই গীতার ভগবান পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সেজন্য ড. আম্বেদকর বৌদ্ধধর্মের উত্থানকে প্রাচীন ভারতের বিপ্লব বলেছেন ; আর ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে প্রতিবিপ্লব বলেছেন।—- ধন্যবাদ!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন